DEV Community

Ummah Network
Ummah Network

Posted on

নবিজীর ওফাতের পর সাহাবীদের অবস্থা-

১১ হিজরির ১২ রবিউল আউয়াল। দুপুরের পর সমগ্র মদীনা শোকের সাগরে নিমজ্জিত হয়ে গেল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইন্তেকাল করেছেন—এই সংবাদ যেন সাহাবায়ে কেরামের হৃদয়কে মুহূর্তেই স্তব্ধ করে দিল।
যাঁরা তাঁকে ভালোবাসতেন প্রাণের চেয়েও বেশি, যাঁদের জীবন, ঈমান, আশা ও ভালোবাসার কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন তিনি, হঠাৎ তাঁরা এমন এক সংবাদ শুনলেন যা মেনে নেওয়া তাঁদের জন্য মোটেও সহজ ছিলনা।
তাঁদের কাছে রাসুল ﷺ ছিলেন পৃথিবীর সবচেয়ে প্রিয় মানুষ, তিনিই ছিলেন সবচেয়ে আপন ও বিশ্বস্ত মানুষ। অথচ এখন আর তিনি দুনিয়াতে নেই। আর তাঁর কণ্ঠ আর শোনা যাবে না। তাঁর সঙ্গে আর বসা হবে না। তাঁর হাতে আর বায়আত করা হবে না। আর কখনো তাঁর সদা হাস্যোজ্জল মুবারক মুখখানি দেখা যাবে না। তাঁর পবিত্র মুখ থেকে আর সরাসরি ওহীর বাণী শোনা হবেনা।

এটা যেন সাহাবীরা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিলেন না। নবিজী আর দুনিয়াতে নেই এই কথা নিজের মনকে বিশ্বাস করাতে পারছিলেন না।

সেদিন উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর মত কঠিন দিলের মানুষও ভেঙ্গে পড়েছিলেন। তিনি এতটাই মর্মাহত হয়ে পড়েছিলেন যে, রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর ইন্তেকালের সংবাদ পর্যন্ত মেনে নিতে পারছিলেন না। তিনি বলছিলেন- আল্লাহর কসম, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যু হয়নি। পরে তিনি বলেছেন- আল্লাহর কসম, তখন আমার অন্তরে এ বিশ্বাসই ছিল আল্লাহ্ অবশ্যই তাঁকে পুনরায় জীবিত করবেন এবং তিনি কিছু সংখ্যক লোকের (যারা বলছে নবিজী মারা গেছেন) হাত-পা কেটে ফেলবেন। -[বুখারী ৩৬৬৭]

এদিকে ফাতিমা রাদিয়াল্লাহু আনহার অবস্থা ছিল আরও করুণ। নবিজী ﷺ-এর ওফাতে তাঁর উপর যেন শোকের পাহাড় নেমে এসেছিল। যে পিতা ছিলেন তাঁর জীবনের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়, তাঁর চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যেন পৃথিবীর সমস্ত আলোই ম্লান হয়ে গেল। তিনি কোনভাবেই এই শোক সইতে পারছিলেন না।
আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু ফাতিমা রাদিয়াল্লাহু আনহার সেদিনের অবস্থা বর্ণনা দিয়েছেন।
عَنْ أَنَسٍ قَالَ لَمَّا ثَقُلَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم جَعَلَ يَتَغَشَّاهُ فَقَالَتْ فَاطِمَةُ عَلَيْهَا السَّلَام وَا كَرْبَ أَبَاهُ فَقَالَ لَهَا لَيْسَ عَلَى أَبِيْكِ كَرْبٌ بَعْدَ الْيَوْمِ فَلَمَّا مَاتَ قَالَتْ يَا أَبَتَاهُ أَجَابَ رَبًّا دَعَاهُ يَا أَبَتَاهْ مَنْ جَنَّةُ الْفِرْدَوْسِ مَأْوَاهْ يَا أَبَتَاهْ إِلَى جِبْرِيْلَ نَنْعَاهْ فَلَمَّا دُفِنَ قَالَتْ فَاطِمَةُ عَلَيْهَا السَّلَام يَا أَنَسُ أَطَابَتْ أَنْفُسُكُمْ أَنْ تَحْثُوْا عَلَى رَسُوْلِ اللهِ صلى الله عليه وسلم التُّرَابَ
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর অসুস্থতা যখন ক্রমেই তীব্র হয়ে উঠল এবং মৃত্যুযন্ত্রণা তাঁকে আচ্ছন্ন করে ফেলল, তখন ফাতিমা (রা.) গভীর বেদনায় বলে উঠলেন- হায়! আমার বাবার কতইনা কষ্ট হচ্ছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ তখন তাঁকে বললেন- আজকের পর তোমার বাবার আর কোনো কষ্ট থাকবে না।
অতঃপর যখন রাসূলুল্লাহ ﷺ ইন্তিকাল করলেন, তখন শোকে মুহ্যমান ফাতিমা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলতে লাগলেন- “হায় আমার বাবা!
তিনি তো সেই রবের ডাকে সাড়া দিলেন, যিনি তাঁকে ডেকেছিলেন।
হায় আমার বাবা! তাঁর আবাস জান্নাতুল ফিরদাউস—তিনি আজ সেখানে চলে গেলেন। হায় আমার বাবা! আজ আমরা জিবরীল আলাইহিসসালামের কাছে আপনার শোকের সংবাদ জানাব!”

এরপর যখন রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে দাফন করা হলো, তখন ফাতিমা রাদিয়াল্লাহু আনহা আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বললেন- হে আনাস! সত্যিই কি তোমাদের মন মানল যে, তোমরা প্রিয় রাসূল ﷺ- কে মাটির নিচে শুইয়ে দিয়ে আসলে! –[বুখারী ৪৪৬২]

চারদিকে তখন শুধু কান্না, শোক আর হাহাকার। মনে হচ্ছিল, মদিনার প্রতিটি পথ, প্রতিটি ঘর, প্রতিটি হৃদয় যেন প্রিয় মানুষটিকে হারিয়ে শোকে পাথর হয়ে গেছে।
সেই কঠিন ও শোকাবহ মুহূর্তে নরম হৃদয়ের অধিকারী হজরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু পাহাড়সম দৃঢ়তা দেখালেন। যখন সাহাবায়ে কেরামের অনেকেই শোকে হতবিহ্বল, কিংকর্তব্যবিমূঢ়, তখন তাঁর দৃঢ় কণ্ঠ ও প্রজ্ঞাপূর্ণ অবস্থান সাহাবীদেরকে বাস্তবতাকে মেনে নেওয়ার শক্তি জোগাল। সেই সংকটময় মুহূর্তে তিনি বিপর্যস্ত উম্মতের জন্য কাণ্ডারি ও পথপ্রদর্শকের ভূমিকা পালন করেন।
তিনি মিম্বরে দাঁড়িয়ে বললেন-
أَلَا مَنْ كَانَ يَعْبُدُ مُحَمَّدًا فَإِنَّ مُحَمَّدًا قَدْ مَاتَ وَمَنْ كَانَ يَعْبُدُ اللهَ فَإِنَّ اللهَ حَيٌّ لَا يَمُوْتُ وَقَالَ إِنَّكَ مَيِّتٌ وَّإِنَّهُمْ مَيِّتُوْنَ (الزمر) وَقَالَ وَمَا مُحَمَّدٌ إِلَّا رَسُوْلٌ قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِهِ الرُّسُلُ أَفَإِنْ مَاتَ أَوْ قُتِلَ انْقَلَبْتُمْ عَلٰى أَعْقَابِكُمْ وَمَنْ يَّنْقَلِبْ عَلٰى عَقِبَيْهِ فَلَنْ يَّضُرَّ اللهَ شَيْئًا وَسَيَجْزِي اللهُ الشَّاكِرِيْنَ (آل عمران) قَالَ فَنَشَجَ النَّاسُ يَبْكُوْنَ
যারা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইবাদাতকারী ছিলে তারা জেনে রাখ, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মারা গেছেন। আর যারা আল্লাহর ইবাদাত করতে তারা নিশ্চিত জেনে রাখ আল্লাহ্ চিরঞ্জীব, তিনি অমর।
অতঃপর আবূ বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু এই আয়াত তিলাওয়াত করলেনঃ (অর্থ) নিশ্চয়ই আপনি মরণশীল আর তারা সকলেই মরণশীল-(সুরা যুমার ৩০)।
এরপর এই আয়াত তিলাওয়াত করলেনঃ (অর্থ) মুহাম্মাদ হচ্ছেন কেবল একজন রাসূল। তাঁর পূর্বে আরও অনেক রসূল গত হয়েছে; কাজেই যদি তিনি মারা যান কিংবা নিহত হন, তবে তোমরা কি তোমাদের পেছনে ফিরে যাবে? আর যে ব্যক্তি পেছনে ফিরে যায়, সে কখনো আল্লাহর কোন ক্ষতি করতে পারে না। আর আল্লাহ অচিরেই কৃতজ্ঞদের প্রতিদান দেবেন। (আলে ইমরান ১৪৪)।
রাবী বলেন, উপস্থিত সবাই আবু বকর রাদিল্লাহু আনহুর কথা শুনে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলেন। -[বুখারী ৩৬৬৮]

আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর বয়ান ও কোরআনের এই আয়াত শুনে সাহাবীদের ঘোর কাটে। সবার বিশ্বাস হয়, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সত্যিই ইন্তিকাল করেছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।

সেদিন তিনি চলে গিয়েছেন কিন্তু উম্মাহর কাঁধে দ্বীনের মহান দায়িত্ব অর্পণ করে গেছেন। সাহাবায়ে কেরাম পরিপূর্ণ সততা ও নিষ্ঠার সাথে সেই দায়িত্ব পালন করেছেন। দ্বীনের আলো দিক দিগন্তে পৌঁছে দিয়েছেন। মুসলিমদের জন্য নির্বিঘ্নে ইসলাম পালন এবং ইসলামের পতাকাকে সমুন্নত করার জন্য লক্ষ লক্ষ বর্গমাইল জমিন ইসলামের ছায়াতলে এনে দিয়েছেন। নবিজী যেভাবে দ্বীনকে রেখে গেছেন সেভাবে অবিকৃত অবস্থায় পরবর্তীদের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রেখে যাওয়া সেই দায়িত্ব আমাদের কাঁধেও অর্পিত, কিন্তু আমরা সেই দায়িত্ব কতটা আদায় করছি, দ্বীন ইসলামকে বিজয়ী করার জন্য নববী পদ্ধতিতে কতটুকু কাজ করছি? আসুন মুহাসাবা করি। আসুন, সাহাবীদের পদাঙ্ক অনুসরণ করি!!

Top comments (0)