বিদ্যমান রাষ্ট্র কাঠামোয় ইসলাম কায়েম করা যে সম্ভব নয় এটি এখন সবার সামনে দিনের আলোর মত স্পষ্ট, এই কারণেই বড় বড় ইসলামী দলের কর্ণধাররা এখন আর ক্ষমতায় গিয়ে ইসলাম প্রতিষ্ঠার কথা বলেন না, তারা এখন ওয়েলফেয়ার স্টেইট বা কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা বলেন (অনেকে আবার একটা গোষ্ঠীকে খুশি করার জন্য ইসলামী দণ্ডবিধি প্রতিষ্ঠার দাবি নাকচও করেন।) [১]
এটা আসলে হওয়ারই ছিল, যেই সিস্টেম তৈরি হয়েছে গ্রীক দার্শনিকদের হাত ধরে, যেই সিস্টেম বিংশ শতকে পুনরায় প্রতিষ্ঠা পেয়েছে মানবতার শত্রু পশ্চিমাদের হাত ধরে, যেই সিস্টেম প্রতিষ্ঠার জন্য এখন পর্যন্ত কয়েক মিলিয়ন মুসলিমের রক্ত ঝরিয়েছে সন্ত্রাসী আমেরিকা ও ইউরোপ, যেই সিস্টেম প্রতিষ্ঠার জন্য উসমানী সালতানাতকে ধ্বংস করা হয়েছে, সেই সিস্টেম দিয়ে যে ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর কোন কল্যাণ হবেনা তা বলাই বাহুল্য।
দুই, এই সিস্টেম এতটাই পচা ও নোংরা যে, এর দায়িত্বে যদি বড় বড় আলেমদেরকেও বসানো হয় তারাও সিস্টেমের কারণে অনেক খারাপ কাজ করতে বাধ্য হবেন। কিছুদিন আগে ধর্ম উপদেষ্টা তাঁর এক বক্তব্যে এই সত্য স্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন- ‘যদি কোনো বিশিষ্ট আলেমকেও স্ব'রা'ষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বসিয়ে দেওয়া হয়, রা*ষ্ট্রের কারণে তাকেও মদের লাইসেন্স দিতে হবে।’[২]
গ'ণ'তান্ত্রিক পদ্ধতিতে ইসলাম কায়েম কেন সম্ভব নয় সেই সম্পর্কে সংক্ষেপে আরো কিছু পয়েন্ট স্মরণ করিয়ে দেই-
১। ইসলাম ও গ'ণ'তন্ত্র দুটি দুই মেরুর। ইসলামের মূল কথা হল আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের নির্দেশই চূড়ান্ত। জীবনব্যাবস্থা ও বিধি-বিধান প্রণয়নে মানুষের মতামত দেওয়ার কোনো অধিকার নেই।
আর গ'ণ'তন্ত্রের মূল কথা হল, অধিকাংশ জনগণের মতামত ও চাওয়া হল চূড়ান্ত।
তবে এই দাবীতে গ'ণ'তান্ত্রিকরা পুরোপুরী সত্যবাদী না, বাস্তবে দেখা যায়- কর্পোরেট শ্রেণি, বিদেশী প্রভূ এবং গুটিকতক বিকৃত রুচির সাংস্কৃতিক মোড়লের চাওয়াই চূড়ান্ত হয়। এই কারণেই আমরা গ'ণ'তান্ত্রিক দেশে এমন অনেক বিল পাশ হতে দেখি যার পক্ষে জনগণের দশ শতাংশেরও সমর্থন নেই। যেমন ট্রান্সজেন্ডার, সমকামিতা, গানের টিচার নিয়োগ ইত্যাদি।
২। প্রত্যক্ষ উপনিবেশের যুগ শেষ হলেও কলোনিয়াল যুগের মন মানসিকতার লোক কিন্তু শেষ হয়নি। এখনো দেশের বড় বড় ব্যবসা, মিডিয়া, সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলো ইসলাম বিদ্বেষীদের দখলে। দেশকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় এই ধরণের বড় বড় পদগুলোও তাদেরই দখলে।
এই লোকগুলো শুধু ইসলামবিদ্বেষীই নয়, বিদেশীদের এজেন্টও। এরা সব সময় দেশে বিদেশী প্রভূদের এজেন্ডা বাস্তবায়নের চেষ্টায় থাকে। এই লোকগুলো কোনভাবেই দেশে ইসলামপন্থীদের ক্ষমতায় যেতে দেবেনা, ক্ষমতায় গেলেও ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে দেবেনা।
সংঘাতের মাধ্যমে এই শক্তিকে পরাজিত করা ছাড়া ইসলামপন্থীদের জন্য ক্ষমতায় টিকে থাকা এবং ইসলাম প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।
মিশরে এই শক্তিই মুরসী সরকারের পতন ঘটিয়েছিল এবং হাজার হাজার ইখওয়ান সদস্যের রক্ত ঝরিয়েছিল।
৩। বাংলাদেশে অনেকগুলো গ'ণ'তান্ত্রিক দল আছে। এর মধ্যে মাঝারী ও ছোট কয়েকটা দল ইসলামের নামে রাজনীতি করলেও বাকিগুলো সেক্যুলার আদর্শের রাজনীতি করে। তারা ইতিমধ্যেই শরীয়াহ আইনে বিশ্বাস করেনা বলে ঘোষণা দিয়েছে।
ধরা যাক, এই নির্বাচনে ইসলামী দলগুলো ক্ষমতায় আসল এবং ইসলাম প্রতিষ্ঠা করল। তারা কিন্তু এই কথার উপরই ক্ষমতা আসতে হবে যে, পরবর্তী নির্বাচনে সেক্যুলার দল বিজয়ী হলে তাদের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দেবে।
তখন সেক্যুলাররা ক্ষমতায় এসে আবারও সেক্যুলার আইন প্রতিষ্ঠা করবে। সে সময় আবার সবাইকে আল্লাহর আইন বাদ দিয়ে সেক্যুলার আইন মেনে নিতে হবে। এভাবে আল্লাহর আইন এক খেল তামাশার বস্তুতে পরিণত হবে।
এই ধরণের প্রস্তাব কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকেও দেওয়া হয়েছিল। কাফেররা বলেছিল- হে মুহাম্মাদ! এক বছর আমরা তোমার রবের ইবাদত করব, আরেক বছর তুমি আমাদের মূর্তির পূজা করবে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা কাফেরদের এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে দিয়েছেন। এরই প্রেক্ষিতে সুরা কাফিরুন নাযিল করেছেন। [তাফসীরে তাবারী, তাফসীরে দুররে মানসূর]
৪। অনেকে বলেন যে, ক্ষমতায় গেলে আমরা সবাইকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে ইসলামের পক্ষে করে ফেলব। তখন গণভোটের আয়োজন হলে অধিকাংশ মানুষ ইসলামের পক্ষে রায় দেবে। এভাবে আমরা সংবিধান সংশোধন করে ইসলাম কায়েম করব।
কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখছি তারা মানুষকে বদলে দেওয়া পরিবর্তে নিজেরাই পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছেন। ক্ষমতায় গেলে ইসলাম দণ্ডবিধি বাস্তবায়ন করব এই কথা বলতেও ভয় পাচ্ছেন। ওয়েলফেয়ার স্টেইট ইত্যাদি বলে মানুষকে খুশি রাখার চেষ্টা করছেন।
তাদের কেউ কেউ রোজা পূজা এক করে দিচ্ছেন, কেউ আবার পূজায় শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন, মন্ত্র পাঠ করছেন, পূজার জন্য দান করছেন।
অনেকে আবার দলের নামই পরিবর্তন করে ফেলেছেন, কেউ পরিবর্তন করেছেন দলের লোগো।
৫। ইসলাম কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর অনুমতির উপর নির্ভরশীল দ্বীন নয়। সব মুসলিমের জন্য ইসলাম পালন করা বাধ্যতামূলক। অপরদিকে মানুষের মতামত পরিবর্তনশীল। আজ যারা ভোট দিয়ে ইসলামকে জয়যুক্ত করল কাল তারা কারো প্ররোচনায় পড়ে বিরোধী পক্ষকেও ভোট দিতে পারে। কারো প্ররোচনায় পড়ে বা লোভ লালসার শিকার হয়ে দুইদিন পর মানুষ যদি ভিন্ন আইন চায় তখন কি গ'ণ'তান্ত্রিক পথে প্রচেষ্টাকারী আমাদের ভাইয়েরা আবারো ভিন্ন আইন প্রতিষ্ঠা করবেন?
আশা করি উপরের আলোচনা থেকে গ'ণ'তন্ত্রের মাধ্যমে কেন ইসলাম প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয় বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সহীহ পদ্ধতিতে ইসলাম কায়েমের কাফেলায় যুক্ত হওয়ার এবং আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীন কায়েম করার তাওফীক দান করুন।
[১] https://youtu.be/qT5oa4xglzE?t=155
https://share.google/0P7FVo2MoXpaENSwU
[২] https://www.tbsnews.net/.../bangladesh/news-details-405531
Top comments (0)