DEV Community

নামাজে "খুশু-খুযু"উম্মতের হারিয়ে যাওয়া এক অমূল্য নেয়ামত


হাদীসের ভাষ্যমতে এই উম্মত হতে সর্বপ্রথম যেই ইলম ও নেয়ামত উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে তা হল খুশু খুযু। এখন আমরা নামায পড়ি ঠিকই কিন্তু নামাযে খুশু খুযু থাকেনা। বর্তমানে খুশু খুযুর সাথে নামায আদায়কারীর সংখ্যা খুবই নগন্য।
বর্তমানে অধিকাংশ মসজিদের অবস্থা হল, মুসল্লিদের কারো মধ্যেই খুশু খুযু নেই। আমাদের এই দূরাবস্থার কথা চৌদ্দশ বছর আগেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবায়ে কেরাম উপলব্ধি করেছিলেন। হাদিসে এসেছে-
عَنْ جُبَيْرِ بْنِ نُفَيْرٍ عَنْ أَبِي الدَّرْدَاءِ، قَالَ كُنَّا مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَشَخَصَ بِبَصَرِهِ إِلَى السَّمَاءِ ثُمَّ قَالَ " هَذَا أَوَانٌ يُخْتَلَسُ الْعِلْمُ مِنَ النَّاسِ حَتَّى لاَ يَقْدِرُوا مِنْهُ عَلَى شَيْءٍ " . فَقَالَ زِيَادُ بْنُ لَبِيدٍ الأَنْصَارِيُّ كَيْفَ يُخْتَلَسُ مِنَّا وَقَدْ قَرَأْنَا الْقُرْآنَ فَوَاللَّهِ لَنَقْرَأَنَّهُ وَلَنُقْرِئَنَّهُ نِسَاءَنَا وَأَبْنَاءَنَا . فَقَالَ " ثَكِلَتْكَ أُمُّكَ يَا زِيَادُ إِنْ كُنْتُ لأَعُدُّكَ مِنْ فُقَهَاءِ أَهْلِ الْمَدِينَةِ هَذِهِ التَّوْرَاةُ وَالإِنْجِيلُ عِنْدَ الْيَهُودِ وَالنَّصَارَى فَمَاذَا تُغْنِي عَنْهُمْ " . قَالَ جُبَيْرٌ فَلَقِيتُ عُبَادَةَ بْنَ الصَّامِتِ قُلْتُ أَلاَ تَسْمَعُ إِلَى مَا يَقُولُ أَخُوكَ أَبُو الدَّرْدَاءِ فَأَخْبَرْتُهُ بِالَّذِي قَالَ أَبُو الدَّرْدَاءِ قَالَ صَدَقَ أَبُو الدَّرْدَاءِ إِنْ شِئْتَ لأُحَدِّثَنَّكَ بِأَوَّلِ عِلْمٍ يُرْفَعُ مِنَ النَّاسِ الْخُشُوعُ يُوشِكُ أَنْ تَدْخُلَ مَسْجِدَ جَمَاعَةٍ فَلاَ تَرَى فِيهِ رَجُلاً خَاشِعًا
আবু দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আমরা নবী ﷺ এর সঙ্গে ছিলাম। তিনি আসমানের দিকে তাকালেন, এরপর বললেনঃ এটা হল মানুষের থেকে ইলম উঠিয়ে নেওয়ার ক্ষণ। এক পর্যায়ে (অবস্থা এমন দাঁড়াবে যে) ইলম বিষয়ে তাদের কোন সক্ষমতা থাকবে না।
যিয়াদ ইবনে লাবীদ আনসারী রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেনঃ আমাদের থেকে কিভাবে ইলম উঠিয়ে নেওয়া হবে, অথচ আমরা কুরআন পড়েছি। আল্লাহর কসম, অবশ্যই তা আমরা পড়ব এবং আমাদের স্ত্রী–কন্যা ও সন্তান–সন্ততিদেরও পড়াব।
তিনি বললেনঃ তোমার মা তোমাকে হারিয়ে ফেলুক (ভর্ৎসনামূলক শব্দ) হে যিয়াদ। আশ্চর্য! আমি তো তোমাকে মদীনার প্রজ্ঞাবান ফকীহদের একজন বলে মনে করতাম!
ইয়াহুদী–নাসারাদের কাছেও তো তাওরাত–ইনজিল আছে। কিন্ত এতে কি কোন উপকার হয়েছে তাদের?
জুবাইর রহিমাহুল্লাহ বলেনঃ পরে আমি উবাদা ইবনে সামিত রাদিয়াল্লাহু আনহুর সঙ্গে সাক্ষাত করলাম। বললামঃ আপনার ভাই আবু দারদা কি বলছেন তা কি আপনি শোনেন নি?

এরপর আমি তাঁকে আবু দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহুর রিওয়ায়াতের বিবরণ দিলাম। তিনি বললেনঃ আবু দারদা ঠিকই বলেছেন। তুমি চাইলে ইলমের যে বস্তটি প্রথম উঠিয়ে নেয়া হবে সে সম্পর্কে বলতে পারি, তা হল ‘খুশু–খুযু’। এমন একটা সময় আসবে যখন তুমি মসজিদের জামাতে নামায আদায়কারী একজনকেও খুশু খুযুর সাথে আদায় করতে দেখবেনা। -[তিরমিজি ২৬৫৩]

আমরা আল্লাহ থেকে দূরে সরতে সরতে এতটাই দূরে সরে গেছি যে, ব্যাপকভাবে সবাই খুশু খুযু হারিয়ে ফেলেছি। এখন আর নামাযে দাঁড়িয়ে মজা পাইনা, নামাযের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের অনুভূতি লাভ করিনা। সবাই কেমন যেন যন্ত্রের মত আবেগ অনুভূতি হীনভাবে নামায আদায় করে যাই। কিন্তু সফলতা চাইলে তো এভাবে নামায পড়লে হবেনা। খুশু খুযুর সাথে পড়তে হবে। আল্লাহ তাআলা বলেছেন-
قَدۡ اَفۡلَحَ الۡمُؤۡمِنُوۡنَ ۙ﴿۱﴾ الَّذِیۡنَ هُمۡ فِیۡ صَلَاتِهِمۡ خٰشِعُوۡنَ ۙ﴿۲﴾
অবশ্যই সফলকাম হয়েছে মুমিনগণ, যারা নিজদের সালাতে বিনয়াবনত। -[সুরা মুমিনুন ১-২]
খুশু খুযু অর্জন করার কিছু উপায়-
পূর্বপ্রস্তুতি: নামাযের জন্য কিছু সময় আগ থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করুন। উত্তমভাবে অযু করে আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর জন্য নিজেকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করুন। তাড়াহুড়া করে না গিয়ে একটু আগে আগে মসজিদে উপস্থিত হোন।
আল্লাহর বড়ত্বের উপলব্ধি: নামাযে দাঁড়ানোর সময় মনে করুন, আপনি সর্বশক্তিমান আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি আপনাকে দেখছেন, আপনার প্রতিটি নড়াচড়া এবং রুকু সিজদা তিনি লক্ষ্য করছেন। আপনার কেরাত তাসবীহ তাকবীর ইত্যাদি পাঠ তিনি শুনছেন। আপনার মন কোন দিকে আছে, কী বিষয়ে ভাবছেন সেই খবরও তিনি জানছেন।
তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে যদি তাঁকে বাদ দিয়ে অন্য কিছু নিয়ে চিন্তা করি তাহলে তিনি আমাকে মহব্বত করবেন না। তাই কোনভাবেই যেন আল্লাহ ছাড়া ভিন্ন দিকে চিন্তা না যায় সেই চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ।

ধীরে-সুস্থে নামায আদায়: প্রতিটি রুকন ধীরে-সুস্থে ও সুন্নাহসম্মতভাবে আদায় করুন। একদমই তাড়াহুড়া করবেন না। কেরাত তাসবীহ তাহমীদ ও দোয়াসমূহ পড়ার ক্ষেত্রে প্রতিটা শব্দ তারতীলের সাথে সুন্দরভাবে পড়ুন।
অর্থ বুঝে পড়া: নামাযে যা কিছু (কেরাত, তাশাহুদ, দুরুদ, তাসবীহ) পাঠ করা হয় তার অর্থ জেহেনে রাখুন। অবচেতন মনে বা বেখেয়ালে পাঠ করা থেকে বিরত থাকুন। প্রতিটা আয়াত এবং তাসবীহ পাঠ করার সময় মর্ম ও উদ্দেশ্য অন্তরের গভীর থেকে উপলব্ধি করার চেষ্টা করুন।
মনের লাগাম টেনে ধরা: নামাযে যখনই কোনো দুনিয়াবি চিন্তা মাথায় আসবে সাথে সাথে সেটিকে ঝেড়ে ফেলুন এবং পুনরায় আল্লাহর দিকে মনোযোগ ফিরিয়ে আনুন। যতবার যাবে ততবারই ফিরিয়ে আনুন।
বারবার চেষ্টা করা স্বত্তেও অন্তর এদিক সেদিক চলে যেতে পারে এতে ঘাবড়ে যাবেন না এবং হতাশ হবেন না। মনে করবেন এটি শয়তানের সাথে আপনার যুদ্ধ, শয়তান যে কোন প্রকারে আপনাকে হারাতে চায়। তাই কোনভাবেই যেন শয়তান জয়ী হতে না পারে সেই চেষ্টা করুন।
দোয়া করা: আল্লাহ তাআলা সহজ না করলে কোন কাজই আমাদের পক্ষে করা সম্ভব নয়, তাই খুশু খুযুর সাথে নামায আদায়ের জন্য আল্লাহর কাছে বেশি বেশি দোয়া করুন।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে খুশু খুযুর সাথে নামায আদায়ের তাওফিক দান করুন। আমীন ইয়া রব্বাল আলামীন

Top comments (0)