DEV Community

ত|গু'তের পরিচয়ে উলামাদের বক্তব্য

কুরআনের সর্বশ্রেষ্ঠ আয়াত কোনটি? নিঃসন্দেহে আয়াতুল কুরসি। সূরা বাকারার ২৫৫ নং আয়াত যেখানে মহামহিম আল্লাহ তা'আলার পরিচয় ও প্রশংসা করা হয়েছে।
এই আয়াত নিয়ে নতুন করে আলোচনা করার কিছু নেই। তাই শুধু আয়াত ও তার অর্থটি উল্লেখ করে দিচ্ছিঃ
ٱللَّهُ لَآ إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ ٱلْحَىُّ ٱلْقَيُّومُ لَا تَأْخُذُهُۥ سِنَةٌ وَلَا نَوْمٌ لَّهُۥ مَا فِى ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَمَا فِى ٱلْأَرْضِ مَن ذَا ٱلَّذِى يَشْفَعُ عِندَهُۥٓ إِلَّا بِإِذْنِهِۦ يَعْلَمُ مَا بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَمَا خَلْفَهُمْ وَلَا يُحِيطُونَ بِشَىْءٍ مِّنْ عِلْمِهِۦٓ إِلَّا بِمَا شَآءَ وَسِعَ كُرْسِيُّهُ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلْأَرْضَ وَلَا يَـُٔودُهُۥ حِفْظُهُمَا وَهُوَ ٱلْعَلِىُّ ٱلْعَظِيمُ
"আল্লাহ এমন এক চিরঞ্জীব ও চিরন্তন সত্তা যিনি সমগ্র বিশ্ব-জাহানের দায়িত্বভার বহন করছেন, তিনি ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই। তিনি ঘুমান না এবং তন্দ্রাও তাঁকে স্পর্শ করে না। পৃথিবী ও আকাশে যা কিছু আছে সবই তাঁর। কে আছে তাঁর অনুমতি ছাড়া তাঁর কাছে সুপারিশ করবে? যা কিছু মানুষের সামনে আছে তা তিনি জানেন এবং যা কিছু তাদের অগোচরে আছে সে সম্পর্কেও তিনি অবগত। তিনি নিজে যে জিনিসের জ্ঞান মানুষকে দিতে চান সেটুকু ছাড়া তাঁর জ্ঞানের কিছুই তারা আয়ত্ব করতে পারে না। তাঁর কর্তৃত্ব আকাশ ও পৃথিবী ব্যাপী। এগুলোর রক্ষণাবেক্ষন তাঁকে ক্লান্ত পরিশ্রান্ত করে না। মূলত তিনিই এক মহান ও শ্রেষ্ঠ সত্তা।"
এই আয়াতের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়ার সাথে সাথে এর পরের আয়াতের প্রতিও মনোনিবেশ করা প্রয়োজনঃ
لَآ إِكْرَاهَ فِى ٱلدِّينِ قَد تَّبَيَّنَ ٱلرُّشْدُ مِنَ ٱلْغَىِّ فَمَن يَكْفُرْ بِٱلطَّٰغُوتِ وَيُؤْمِنۢ بِٱللَّهِ فَقَدِ ٱسْتَمْسَكَ بِٱلْعُرْوَةِ ٱلْوُثْقَىٰ لَا ٱنفِصَامَ لَهَا وَٱللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ
"দ্বীনের ব্যাপারে কোন জোর-জবরদস্তি নেই। ভ্রান্ত মত ও পথ থেকে সঠিক মত ও পথকে ছাঁটাই করে আলাদা করে দেয়া হয়েছে। এখন যে কেউ ত|গু'তকে অস্বীকার করে আল্লাহর ওপর ঈমান আনে, সে এমন একটি মজবুত অবলম্বন আঁকড়ে ধরে, যা কখনো ছিন্ন হয় না। আর আল্লাহ‌ সবকিছু শোনেন ও জানেন।"
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে এটা অনুধাবন করা যে আল্লাহ তা'আলা নিজের পরিচয় দেওয়ার পর নিজের প্রতি ঈমান আনার কথা যেমন বলেছেন, তেমনি বলেছেন ত|গু'ত বা মিথ্যা ইলাহকে অস্বীকার করার কথা। কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে আমরা যে ত|গু'তকে বর্জন করবো ও অস্বীকার করবো, তার ব্যাপারে আমরা সম্যক অবগত নই।
চলুন আজ তাই জেনে নেওয়ার চেষ্টা করি, উম্মতের মহান ইমাম ও আলেমগণ ত|গু'ত বলতে কী বুঝিয়েছেন।
হজরত উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেনঃ "ত|গু'ত হচ্ছে শয়তান" (তাফসীর ইবনে কাসির ও তাফসীরে তাবারি, সূরা নিসাঃ ৫১)
হজরত উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু যে ত|গু'তকে শয়তান বলেছেন, এ সম্পর্কে ইমাম ইবনে কাসির রাহিমাহুল্লাহ বলেনঃ "আর 'ত|গু'ত' সম্পর্কে তাঁর এই কথার অর্থ যে — 'সে হলো শয়তান' — এটি অত্যন্ত শক্তিশালী মত। কারণ এটি জাহেলিয়্যাতের যুগের মানুষদের সকল অনিষ্টকে অন্তর্ভুক্ত করে — যেমন মূ/র্তিপূজা, সেগুলোর কাছে বিচার প্রার্থনা করা এবং সেগুলোর কাছে সাহায্য চাওয়া।" (তাফসীর ইবনে কাসির, সূরা বাকারাহঃ ২৫৬)
হজরত জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেনঃ "তারা হলো কাহেন (জ্যোতিষী/গণক), যাদের উপর শয়তানরা অবতরণ করে।" (তাফসীর ইবনে কাসির, সূরা নিসাঃ ৫১)
হজরত ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেনঃ "ত|গু'ত হলো — সেই সকল লোক, যারা মূ/র্তিগুলোর সামনে থাকে এবং মূ/র্তিদের পক্ষ থেকে মিথ্যা কথা বলে ও ব্যাখ্যা দেয়, যাতে তারা মানুষকে পথভ্রষ্ট করতে পারে।" (তাফসীরে তাবারি, তাফসীর ইবনুল জাওযি, সূরা নিসাঃ ৫১)
হজরত মুজাহিদ রাহিমাহুল্লাহ বলেনঃ "ত|গু'ত হলো মানুষ-রূপী শয়তান — যার কাছে লোকেরা বিচার-ফয়সালার জন্য যায়, এবং সে-ই তাদের নেতা ও কর্তৃত্বকারী।" (তাফসীর ইবনে কাসির, সূরা নিসাঃ ৫১)
ইমাম মালিক রাহিমাহুল্লাহ বলেনঃ "ত|গু'ত হলো সেই সকল কিছু, আল্লাহ তা'আলা ছাড়া যার ইবাদত করা হয়।" (তাফসীর ইবনে কাসির, তাফসীরে কুরতুবি, সূরা নিসাঃ ৫১)
ইমাম তাবারি রাহিমাহুল্লাহ বলেনঃ "'ত|গু'ত' সম্পর্কে আমার কাছে সঠিক মত হলো — সে হলো এমন প্রতিটি সত্তা, যে আল্লাহর বিরুদ্ধে সীমালঙ্ঘন করেছে, অতঃপর তাকে আল্লাহকে ছাড়া ইবাদত করা হয়েছে — হয় সে তার উপাসকদের উপর জোরপূর্বক আধিপত্য বিস্তার করে, অথবা উপাসকরা স্বেচ্ছায় তার আনুগত্য করে তার ইবাদত করে। আর সেই উপাস্য মানুষ হোক, শয়তান হোক, মূ/র্তি হোক, প্রতিমা হোক — কিংবা যা-ই হোক না কেন।" (তাফসীরে তাবারি, সূরা বাকারাহঃ ২৫৬)
ইমাম কুরতুবি রাহিমাহুল্লাহ বলেনঃ "আরো বলা হয় (জিবত ও ত|গু'ত হলো) — এমন প্রতিটি বস্তু, আল্লাহকে ছাড়া যার ইবাদত করা হয়, অথবা আল্লাহর অবাধ্যতায় যার আনুগত্য করা হয়। আর এই ব্যাখ্যাটি অত্যন্ত সুন্দর ও উত্তম।" (তাফসীরে কুরতুবি, সূরা নিসাঃ ৫১)
ইমাম বাগাবি রাহিমাহুল্লাহ বলেনঃ "বলা হয়ঃ আল্লাহ তা'আলাকে ছাড়া যার ইবাদত করা হয়, সে-ই ত|গু'ত। আরও বলা হয়ঃ প্রতিটি এমন বস্তু যা মানুষকে সীমালঙ্ঘনে প্ররোচিত করে (তা-ই ত|গু'ত)।" (তাফসীরে বাগাবি, সূরা বাকারাহঃ ২৫৬)
ইমাম ইবনুল জাওযি রাহিমাহুল্লাহ বলেনঃ "ভাষাবিদগণ, যাদের মধ্যে রয়েছেন ইবনে কুতাইবাহ এবং আয-যাজ্জাজ, তারা বলেনঃ আল্লাহকে ছাড়া যার ইবাদত করা হয় — সে পাথর হোক, মূ/র্তি হোক, অথবা শয়তান হোক — সে-ই হলো 'জিবত' এবং 'ত|গু'ত'।" (তাফসীর ইবনুল জাওযি, সূরা নিসাঃ ৫১)
ইমাম রাযী রাহিমাহুল্লাহ বলেনঃ "ভাষাবিদগণ বলেন: আল্লাহকে ছাড়া যার ইবাদত করা হয়, সে-ই হলো 'জিবত' এবং 'ত|গু'ত'।... আর 'ত|গু'ত' শব্দটি 'তুগইয়ান' থেকে গৃহীত, যার অর্থ হলো পাপাচারে সীমালঙ্ঘন করা। সুতরাং যে ব্যক্তি বড় বড় পাপকার্যের দিকে আহ্বান করে, এই নামটি তার জন্য অপরিহার্য হয়ে যায়। অতঃপর পণ্ডিতগণ এই নামের ব্যবহারকে আরও বিস্তৃত করেছেন, এমনকি তারা এটি জড় বস্তুর উপরেও প্রয়োগ করেছেন।" (তাফসীরে রাযী, সূরা নিসাঃ ৫১)
ইমাম নববী রাহিমাহুল্লাহ বলেনঃ "লাইস, আবু উবাইদা, কিসায়ী এবং অধিকাংশ ভাষাবিদ বলেছেনঃ ত|গু'ত হলো আল্লাহকে ছাড়া যার ইবাদত করা হয় তা-ই।" (শরহে সহীহ মুসলিম)
ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ রাহিমাহুল্লাহ বলেনঃ "'ত|গু'ত' হলো 'তুগইয়ান' থেকে 'ফা'লূত' এর ওজনে গঠিত শব্দ। আর 'তুগইয়ান' অর্থ হলো সীমা অতিক্রম করা — যা হলো জুলুম ও বাড়াবাড়ি। সুতরাং আল্লাহকে ছাড়া যার ইবাদত করা হয়, সে যদি এতে অসন্তুষ্ট না হয়, তাহলে সে ত|গু'ত। এ কারণেই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সহীহ হাদীসে মূ/র্তিগুলোকে 'তা/ও/য়াগীত' (ত|গু'তের বহুবচন) নামে অভিহিত করেছেন, যখন তিনি বলেছিলেন: 'যারা তা/ও/য়াগীতের ইবাদত করে, তারা তা/ও/য়াগীতের অনুসরণ করবে।' আর যে ব্যক্তিকে আল্লাহর নাফরমানিতে আনুগত্য করা হয়, এবং যাকে হিদায়াত ও সত্য দ্বীনের বিপরীত পথে অনুসরণ করা হয় — চাই সে এমন ব্যক্তি হোক যার আল্লাহর কিতাবের বিরোধী কথা গ্রহণ করা হয়, অথবা এমন ব্যক্তি হোক যার আল্লাহর আদেশের বিরুদ্ধে আদেশ মান্য করা হয় — সে-ই ত|গু'ত।" (মাজমু'উল ফাতাওয়া)
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম রাহিমাহুল্লাহ বলেনঃ "ত|গু'ত হলো প্রতিটি এমন বস্তু যার মাধ্যমে বান্দা তার সীমা অতিক্রম করে — চাই সে উপাস্য হোক, অনুসৃত হোক কিংবা আনুগত্যপ্রাপ্ত হোক। সুতরাং প্রতিটি জাতির ত|গু'ত হলো সেই সত্তা, যার কাছে তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে বাদ দিয়ে বিচার প্রার্থনা করে; অথবা আল্লাহকে ছাড়া যার ইবাদত করে; অথবা আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো স্পষ্ট দলিল ছাড়াই যার অনুসরণ করে; অথবা এমন বিষয়ে যার আনুগত্য করে যা আল্লাহর আনুগত্য বলে তারা জানে না।" (ই'লামুল মুওয়াক্কিঈন)
সাইয়্যেদ কুতুব রাহিমাহুল্লাহ বলেনঃ "'ত|গু'ত' হলো 'তুগইয়ান' থেকে গঠিত একটি শব্দকাঠামো, যা এমন সবকিছুকে অন্তর্ভুক্ত করে যা চেতনার উপর বাড়াবাড়ি করে, সত্যের উপর জুলুম করে, এবং আল্লাহ বান্দাদের জন্য নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করে — আর আল্লাহর প্রতি আকীদা এবং আল্লাহর প্রণীত শরীয়তের কোনো নিয়ন্ত্রণ যার উপর থাকে না। এর অন্তর্ভুক্ত হলো প্রতিটি এমন মতবাদ যা আল্লাহর কাছ থেকে উৎসারিত নয়, এবং প্রতিটি এমন ধারণা, ব্যবস্থা, সংস্কৃতি বা রীতিনীতি যা আল্লাহর কাছ থেকে গ্রহণ করা হয়নি। ত|গু'ত হলো এমন প্রতিটি কর্তৃত্ব যা আল্লাহর কর্তৃত্ব থেকে উৎসারিত নয়, এমন প্রতিটি শাসনব্যবস্থা যা আল্লাহর শরীয়তের উপর প্রতিষ্ঠিত নয়, এবং এমন প্রতিটি সীমালঙ্ঘন যা সত্যকে অতিক্রম করে। আর আল্লাহর কর্তৃত্ব, তাঁর ইলাহিয়্যাত এবং তাঁর হাকিমিয়্যাতের উপর সীমালঙ্ঘন হলো সবচেয়ে জঘন্য সীমালঙ্ঘন, সবচেয়ে চরম তুগইয়ান এবং শব্দগত ও অর্থগত উভয় দিক থেকে 'ত|গু'ত' এর অর্থের সবচেয়ে নিকটবর্তী। আহলে কিতাব তাদের আলেম ও পাদ্রিদের সিজদা করেনি, কিন্তু তাদের প্রণীত বিধান মেনে চলেছে — তাই আল্লাহ তাদেরকে তাদের ইবাদতকারী বলে আখ্যায়িত করেছেন এবং মুশরিক বলে অভিহিত করেছেন: اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِنْ دُونِ اللَّهِ — "তারা আল্লাহকে ছাড়া তাদের আলেম ও পাদ্রিদেরকে রব হিসেবে গ্রহণ করেছে।" সুতরাং তারা ত|গু'তের ইবাদত করেছে, অর্থাৎ সেই সীমালঙ্ঘনকারী কর্তৃত্বের যা তার প্রাপ্য অধিকার অতিক্রম করেছে। তারা এদেরকে রুকু-সিজদার অর্থে ইবাদত করেনি, বরং আনুগত্য ও অনুসরণের অর্থে ইবাদত করেছে — আর এ ইবাদতই তার অনুসারীকে আল্লাহর ইবাদত ও আল্লাহর দ্বীন থেকে বের করে দেয়।" (ফী যিলালিল কুরআন, তারীকুদ দা'ওয়াহ ফী যিলালিল কুরআন)
আশা করছি উম্মতের এই মহীরুহদের আলোচনার পর আর বিস্তারিতভাবে ত|গু'তের পরিচয় নিয়ে আলোচনার প্রয়োজন নেই।
এবার আমাদের কাজ হচ্ছে এই সকল ত|গু'তকে চিহ্নিত করা এবং তাদেরকে অস্বীকার করা। মনে রাখবেন, ত|গু'তকে অস্বীকার করা ব্যতীত ঈমান সহীহ হয় না। এটাই হচ্ছে "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" এর মর্ম। অর্থাৎ, "নেই কোনো মাবুদ, আল্লাহ ছাড়া"।

Top comments (0)