DEV Community

সীরাত থেকে শিক্ষা

কোনো এক সফরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাহনে সঙ্গী হলেন তাঁরই এক প্রিয় সাহাবী। আমরা মু‘আয বিন জাবাল রাযিয়াল্লাহু আনহু নামে তাকে জানি। তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশাতেই তাঁর পক্ষ থেকে প্রেরিত হয়ে ইয়েমেন অঞ্চলের রাষ্ট্রীয় গভর্নর হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে মুয়ায রাদিয়াল্লাহু আনহুর স্মৃতিময় একটি ঘটনা ও তা থেকে অর্জিত শিক্ষা নিয়ে আজ আমরা কিছু কথা তুলে ধরছি।
মুয়ায রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন:
“আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গাধার পিঠে তাঁরই পিছনে সহযাত্রী হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলাম।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে ডেকে বললেন—
‘হে মু‘আয!’
আমি বলে উঠলাম—
لَبَّيْكَ يَا رَسُولَ اللَّهِ وَسَعْدَيْكَ
কিছুক্ষণ পর
আবার বললেন—
‘হে মু‘আয!’
আমিও বললাম—
لَبَّيْكَ يَا رَسُولَ اللَّهِ وَسَعْدَيْكَ
এবারও তিনি কিছু বললেন না।
কিছুক্ষণ পর আবার বললেন—
‘হে মু‘আয!’
আমিও বললাম—
لَبَّيْكَ يَا رَسُولَ اللَّهِ وَسَعْدَيْكَ
এবার তিনি না থেমে জিজ্ঞেস করলেন—
‘তুমি জানো কি আল্লাহর হক কী তাঁর বান্দাদের উপর?’
আমি বললাম—
‘আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর রাসূল অধিক জানেন।’
অতঃপর তিনি ইরশাদ করলেন—
‘বান্দাদের উপর আল্লাহর হক হলো, তারা একমাত্র তাঁর ইবাদত করবে এবং তাঁর সাথে কাউকেই কোনোভাবেই শরীক করবে না।’
আবারও খানিকটা নীরবতায় কেটে গেল কিছুক্ষণ।
এরপর তিনি আবারও ডাক দিয়ে বললেন—
‘হে মু‘আয!’
আমি বললাম—
لَبَّيْكَ يَا رَسُولَ اللَّهِ وَسَعْدَيْكَ
এবার তিনি জিজ্ঞেস করলেন—
‘তুমি কি জানো, আল্লাহ তায়ালা তাঁর নিজের উপর বান্দার প্রতি কী হক নির্ধারণ করেছেন, যদি তারা তাঁর হক আদায় করে, অর্থাৎ শিরকমুক্ত ইবাদত করে?’
আমি বললাম—‘আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর রাসূল অধিক জানেন।’
তিনি জবাবে বললেন—
‘যদি তারা আল্লাহর হক আদায় করে, তাহলে আল্লাহ তায়ালা নিজের উপর অবধারিত করে নিয়েছেন যে, তাদের আযাব দেবেন না।’
দ্রষ্টব্য ঃ সহীহ বুখারী: ৫৯৬৭; সহীহ মুসলিম: ৩০
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর বাহন সঙ্গী মু‘আয বিন জাবাল রাযিয়াল্লাহু আনহুর মাঝে এই কথোপকথন থেকে আমাদের জন্য অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে। সবচেয়ে বড় শিক্ষা হল-দ্বীনের মূল হল তাওহিদ, আল্লাহ তায়ালার শিরকমুক্ত ইবাদত। এটাই আখিরাতে মুক্তির মূল চাবিকাঠি। সকল পিতা-মাতার জন্য কর্তব্য হল সন্তানকে তাওহীদের এই শিক্ষা দিয়ে যাওয়া। সকল শিক্ষকের জন্য দায়িত্ব ছাত্রকে তাওহীদ শিখিয়ে যাওয়া।
যে অনুপম শৈলীতে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর প্রিয় সাহাবীর সামনে তাওহীদের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন সেখানেও আমাদের জন্য বহু শিক্ষা রয়েছে। এই শৈলী থেকে আমরা বুঝতে পারি-রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবাদের মাঝের সম্পর্ক ছিল অনেক অকৃত্রিম। একদিকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন সাহাবীদের প্রতি, সমগ্র উম্মাহর প্রতি দরদ, কল্যাণকামনা, দ্বীন শেখানোর উদ্দীপনায় ক্ষেত্রে সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ উসওয়ায়ে হাসানাহ। অন্যদিকে সাহাবারা ছিলেন অকৃত্রিম আদাব ও শিষ্টাচারে সমৃদ্ধ এক নির্বাচিত জামায়াত।
তাই এই যুগের দায়ী, মুজাহিদ ও আমভাবে উলামায়ে কেরাম ও নেতৃবৃন্দের উচিত বিনয়ের সঙ্গে এই দ্বীনকে পৌঁছে দেওয়া, শরীয়াহ ও মানহাজের জ্ঞান বিলিয়ে দেওয়া ঐ পদ্ধতিতেই, যা ছিল আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবীদের আদর্শ। আমাদের জন্য তো মহান আল্লাহ তায়ালা উসওয়ায়ে হাসানাহ রেখেছেন তাঁর নবীর মাঝেই।
তিনি ইরশাদ করেন:
لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ
“নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।”
—সূরা আল-আহযাব, ৩৩:২১।
দ্বিতীয়ত, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে যখন কথা বলতেন, তখন তার গুরুত্ব তুলে ধরার জন্য এক বিশেষ কথোপকথনভঙ্গিমা অবলম্বন করতেন, যাতে শ্রোতা বা সম্বোধিত ব্যক্তির মাঝে আগ্রহ জন্ম নেয়। ফলে কথাটি তার দিলে খুব গভীরভাবে প্রভাব বিস্তার করে, যেমনটা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মু‘আয বিন জাবাল রা.-এর সাথে করেছিলেন।
এতেও রয়েছে আমাদের দায়ী সমাজের জন্য উসওয়ায়ে হাসানাহ। আমরা যখনই দাওয়াতের কাজ করবো, তখনই চেষ্টা করবো খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকেই প্রাধান্য দিতে। আর উপস্থাপন হবে খুবই স্পষ্ট ও আগ্রহ তৈরি করে এমন ভাষায়। আর যেসব শাখাগত বিষয় থেকে শুধু উম্মাহর মাঝে বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়, তা থেকে বিরত থাকবো। সাধারণ সমাজের মাঝে এগুলোর তেমন আওয়াজ তুলবো না, যা উলামায়ে কেরামের অভ্যন্তরীণ মতভিন্নতামূলক বিষয়বস্তু। আর এতে কোনো সন্দেহ নেই, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তাওহীদ ও আকীদার বিশুদ্ধ জ্ঞান, যা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সহচর মু‘আয বিন জাবাল রা.-এর কথোপকথন থেকেও প্রকাশ্য বাক্যেই অনেক স্পষ্ট।
নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উসওয়াহ অনুসরণ করেই পুনর্গঠিত হোক এই উম্মাহ। তাওহীদ হোক সকল কিছুর মূলভিত্তি, সকল কিছুর উর্ধ্বে, সকল কিছুর অগ্রে। মুসলিমদের পারস্পরিক সম্পর্ক হোক অকৃত্রিম মুহাব্বত ও দরদে পূর্ণ। সকল শিক্ষক, দা’য়ী, ও মুবাল্লিগের হৃদয় ভরে উঠুক উম্মহর প্রতি অকৃত্তিম দরদে। আর বিনয় ও আদাবে আলোকিত হোক সকল তালিবুল ইলমের অভিযাত্রা। তাওহীদ ও একমাত্র আল্লাহর ইবাদতের ভিত্তি করে উম্মাহর বিজয়ের সূচনা হোক। ইসলামের দা’য়ীগণ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুপম আদর্শ ও শৈলী অনুসরণ করে তাওহিদের আলো ছড়িয়ে দিক সারা দুনিয়ায়।

Top comments (0)