DEV Community

মানুষের মর্যাদা ও সম্মানের ইসলামী ভিত্তি পর্ব-১


মানুষ আল্লাহ তাআলার এক বিশেষ সৃষ্টি। আল্লাহ তাকে বিবেক, জ্ঞান, উপলব্ধি ও দায়িত্ববোধ দিয়ে পৃথিবীতে প্রেরণ করেছেন। আর মানুষের সুন্দর জীবনযাপনের জন্য ইসলাম যেমন ইবাদতের শিক্ষা দিয়েছে, তেমনি শিক্ষা দিয়েছে আখলাক, আদব ও পারস্পরিক আচরণের সৌন্দর্য।
একটি সুন্দর সমাজ কেবল অর্থনৈতিক উন্নতি বা বাহ্যিক অগ্রগতির মাধ্যমে গড়ে ওঠে না; বরং সেখানে মানুষের মর্যাদা, অধিকার ও সম্মান রক্ষিত হওয়া জরুরি। কারণ যেখানে মানুষ একে অপরকে সম্মান করতে শেখে না, সেখানে সম্পর্ক দুর্বল হয়, হৃদয়ে দূরত্ব সৃষ্টি হয় এবং সমাজে অশান্তি ছড়িয়ে পড়ে।
ইসলাম মানুষকে সম্মান করতে শিখিয়েছে। তবে ইসলামের শিক্ষা হলো, সব মানুষকে সম্মান করতে হবে, কিন্তু প্রত্যেককে তার অবস্থান, দায়িত্ব, সম্পর্ক ও মর্যাদা অনুযায়ী সম্মান দিতে হবে। এটাই ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ শিক্ষা।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَلَقَدْ كَرَّمْنَا بَنِي آدَمَ
“আর অবশ্যই আমি আদম সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি।”
—সূরা আল-ইসরা: ৭০
এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, মানুষ হিসেবে প্রত্যেকের একটি সম্মান ও মর্যাদা রয়েছে। তাই কাউকে অপমান করা, তুচ্ছ করা কিংবা অহংকারবশত হেয় করা ইসলামী চরিত্রের বিপরীত।
তবে একই সঙ্গে ইসলাম আমাদের শেখায়, মানুষের প্রকৃত মর্যাদার মাপকাঠি বাহ্যিক বিষয় নয়; বরং আল্লাহর কাছে মর্যাদার আসল মানদণ্ড হলো তাকওয়া।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِنْدَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ
“নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত সেই ব্যক্তি, যে সবচেয়ে বেশি তাকওয়াবান।”
—সূরা আল-হুজুরাত: ১৩
অতএব, সম্পদ, বংশ, সৌন্দর্য, পদ-পদবি কিংবা সামাজিক অবস্থান মানুষকে আল্লাহর কাছে মর্যাদাবান করে না; বরং ঈমান, তাকওয়া ও উত্তম আমলই প্রকৃত মর্যাদার ভিত্তি।
মানুষের অবস্থান অনুযায়ী সম্মান
ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, প্রত্যেক মানুষকে তার প্রাপ্য অবস্থান অনুযায়ী সম্মান করা। উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা থেকে একটি প্রসিদ্ধ বাণী বর্ণিত হয়েছে—
أَنْزِلُوا النَّاسَ مَنَازِلَهُمْ
“মানুষকে তাদের যথাযথ মর্যাদার স্থানে রাখো।”
আরেক বর্ণনায় এসেছে—
أَمَرَنَا رَسُولُ اللَّهِ ﷺ أَنْ نُنَزِّلَ النَّاسَ مَنَازِلَهُمْ
“রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন, আমরা যেন মানুষকে তাদের যথাযথ মর্যাদা অনুযায়ী স্থান দিই।”
—এ বাণীটি সুনান আবু দাউদ (হাদিস: ৪৮৪২)-এ আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহার সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। মুহাদ্দিসগণ এর সনদ নিয়ে আলোচনা করেছেন; তবে এর অর্থ ইসলামের সামগ্রিক আদব ও নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
এই একটি বাক্যের মধ্যেই মানুষের সঙ্গে আচরণের একটি পূর্ণাঙ্গ নীতি রয়েছে।
একজন বাবা-মায়ের মর্যাদা এক রকম, একজন শিক্ষকের মর্যাদা আরেক রকম। একজন আলেমের অবস্থান এক ধরনের, একজন সাধারণ মানুষের অবস্থান অন্য ধরনের। একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তির কিছু বিশেষ হক রয়েছে, আবার একজন অধীনস্থ ব্যক্তিরও রয়েছে সম্মান ও অধিকার।
সুতরাং ইসলাম আমাদের শেখায় না যে, সবাইকে একইভাবে বিবেচনা করতে হবে; বরং শেখায় প্রত্যেককে তার প্রাপ্য হক ও মর্যাদা অনুযায়ী মূল্যায়ন করতে হবে।
একজন শিশুকে যে আচরণে ভালোবাসা প্রকাশ করা হয়, একজন বয়োজ্যেষ্ঠের ক্ষেত্রে সেখানে শ্রদ্ধা প্রকাশ প্রয়োজন। একজন শিক্ষকের সঙ্গে যে আদব বজায় রাখতে হয়, একজন বন্ধুর সঙ্গে তা ভিন্ন হতে পারে। এটাই ইসলামের সৌন্দর্যপূর্ণ ভারসাম্য।
সম্মান: একজন মুমিনের চরিত্রের পরিচয়
মানুষকে সম্মান করা শুধু সামাজিক সৌজন্য নয়; বরং এটি একজন মুমিনের আখলাকের অংশ।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
الْمُسْلِمُ أَخُو الْمُسْلِمِ، لَا يَظْلِمُهُ وَلَا يَحْقِرُهُ
“একজন মুসলিম অপর মুসলিমের ভাই। সে তার ওপর জুলুম করে না এবং তাকে তুচ্ছ করে না।”
—সহিহ মুসলিম: ২৫৬৪
মানুষকে তুচ্ছ করা, তার অবস্থাকে ছোট করে দেখা কিংবা নিজের শ্রেষ্ঠত্বের অহংকার করা ইসলামী আদবের পরিপন্থী। একজন মুমিনের সৌন্দর্য হলো, সে মানুষের বাহ্যিক অবস্থা দেখে নয়; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টির দৃষ্টিতে মানুষের সঙ্গে আচরণ করে।
মানুষের মর্যাদা ও সম্মানের এই মূলনীতি বোঝার পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে, এই সম্মান বাস্তব জীবনে কীভাবে প্রকাশ পাবে? বয়স, সম্পর্ক ও অবস্থানের ভিত্তিতে মানুষের সঙ্গে আমাদের আচরণ কেমন হওয়া উচিত?

ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী বড়দের সম্মান করা এবং ছোটদের প্রতি স্নেহশীল হওয়া একজন মুমিনের চরিত্রের অন্যতম সৌন্দর্য। ইনশা আল্লাহ, পরবর্তী পর্বে আমরা এ বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

চলবে ...ইনশা আল্লাহ

Top comments (0)