DEV Community

মানুষের প্রাপ্য মর্যাদা: আদব ও ভারসাম্য || পর্ব-৮


মর্যাদা দেওয়া শুধু একটি আদব নয়
ইসলামে মানুষের মর্যাদা রক্ষা কোনো বিচ্ছিন্ন সামাজিক সৌজন্য নয়; বরং এটি একজন মুমিনের ঈমান, তাকওয়া ও চরিত্রের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। একজন মানুষ তার সামনে থাকা ব্যক্তিকে কীভাবে দেখে, তার সঙ্গে কীভাবে কথা বলে, তার ভুলকে কীভাবে মূল্যায়ন করে, দুর্বলতার সময় তার সাথে কীভাবে আচরণ করে, এসবের মধ্যেই তার অন্তরের অনেক কিছু প্রকাশ পায়।
কেউ বড় বলে তাকে সম্মান করা সহজ। কেউ ছোট বলে তাকে স্নেহ করা সহজ। কেউ সম্মানিত ব্যক্তি বলে তার মর্যাদা দেওয়া সহজ। কিন্তু প্রকৃত পরীক্ষা হলো, যে ব্যক্তি আমাদের কোনো উপকার করে না, যার সঙ্গে আমাদের কোনো স্বার্থের সম্পর্ক নেই, কিংবা যার প্রতি আমাদের ব্যক্তিগত পছন্দ নেই, তার সঙ্গেও কি আমরা ইনসাফ ও সম্মানের আচরণ করতে পারি?
এখানেই ইসলামী আদবের সৌন্দর্য। প্রত্যেককে তার প্রাপ্য দেওয়া। ইসলাম মানুষকে সবাইকে একইভাবে দেখার শিক্ষা দেয়নি; বরং প্রত্যেকের প্রাপ্য মর্যাদা তাকে দেওয়ার শিক্ষা দিয়েছে। মা-বাবার হক এক রকম। আলেমের হক এক রকম। শিক্ষকের হক এক রকম। দায়িত্বশীলের হক এক রকম। বয়োজ্যেষ্ঠের হক এক রকম। শিশুর হক এক রকম। প্রতিবেশীর হক এক রকম।
দুর্বল ও অসহায়ের হকও এক বিশেষ দায়িত্ব বহন করে। তাই ন্যায়সংগত মর্যাদা মানে সবাইকে একই আসনে বসানো নয়; বরং যার যে হক, তাকে সেই হক যথাযথভাবে দেওয়া। এই ভারসাম্যই ইসলামী আদবের সৌন্দর্য।
মর্যাদার প্রকৃত ভিত্তি ভুলে যাওয়া যাবে না
তবে একই সঙ্গে আমাদের মনে রাখতে হবে, মানুষের বাহ্যিক মর্যাদা এবং আল্লাহর কাছে তার প্রকৃত মর্যাদা এক বিষয় নয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِندَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ
“নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সর্বাধিক সম্মানিত সে-ই, যে তোমাদের মধ্যে সর্বাধিক তাকওয়াবান।” —সূরা আল-হুজুরাত: ১৩
তাই পদ, সম্পদ, বংশ, সৌন্দর্য কিংবা সামাজিক অবস্থান কাউকে আল্লাহর কাছে শ্রেষ্ঠ বানানোর নিশ্চয়তা দেয় না। আমরা মানুষের সামাজিক ও শরিয়তনির্ধারিত হক আদায় করব; কিন্তু অন্তরের শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি হিসেবে গ্রহণ করব ঈমান ও তাকওয়াকে।
সম্মান চাইলে সম্মান দিতে শিখতে হবে
আমরা প্রত্যেকেই সম্মানিত হতে চাই। কেউ আমাদের কথা গুরুত্ব দিয়ে শুনুক, আমাদের অনুভূতির মূল্য দিক, আমাদের ভুল হলে সুন্দরভাবে বুঝিয়ে দিক—এটি মানুষের স্বাভাবিক চাওয়া। কিন্তু একটি প্রশ্ন হলো, আমি কি অন্যদের জন্যও সেই আচরণটি করি, যা আমি নিজের জন্য প্রত্যাশা করি?
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى يُحِبَّ لِأَخِيهِ مَا يُحِبُّ لِنَفْسِهِ
“তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে নিজের জন্য যা ভালোবাসে, তার ভাইয়ের জন্যও তা ভালোবাসে।” —সহিহ বুখারি: ১৩; সহিহ মুসলিম: ৪৫
তাই আমরা যদি সম্মানিত হতে চাই, তাহলে অন্যকেও সম্মান দিতে হবে। আমরা যদি ভুলের সময় কোমল আচরণ চাই, তাহলে অন্যের ভুলের সময়ও কোমল হতে হবে। আমরা যদি অপমান পছন্দ না করি, তাহলে অন্যকেও অপমান করা যাবে না।
সম্মান রক্ষা শুরু হোক নিজের ঘর থেকে
মানুষের মর্যাদা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আমরা অনেক সময় বাইরের মানুষের কথা ভাবি। অথচ এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো নিজের পরিবার।
মা-বাবার সঙ্গে আমাদের আচরণ কেমন?
সন্তানের সঙ্গে আমাদের ভাষা কেমন?
ছোট ভাই-বোনের সঙ্গে কি আমরা সবসময় তুচ্ছতাচ্ছিল্য করি?
স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কি পরস্পরের সম্মান অক্ষুণ্ণ থাকে?
পরিবারের কোনো সদস্য ভুল করলে আমরা কি তাকে সবার সামনে অপমান করি?
অনেক সময় বাইরের মানুষের সামনে আমরা অত্যন্ত ভদ্র থাকি, অথচ ঘরের মানুষের সঙ্গে আমাদের আচরণ কঠোর হয়ে যায়। এখানেই আত্মশুদ্ধির প্রয়োজন। কারণ প্রকৃত উত্তম চরিত্র হলো, মানুষের সামনে ভালো হওয়ার অভিনয় নয়; বরং একান্ত জীবনেও আল্লাহকে ভয় করে সুন্দর থাকা।
দায়িত্বশীল ও অধীনস্থ—উভয়েরই মর্যাদা আছে
এই লেখার একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো- মর্যাদা একমুখী নয়। দায়িত্বশীলের যেমন সম্মান আছে, অধীনস্থেরও সম্মান আছে। দায়িত্বশীলের বৈধ আদেশ মানতে হবে; কিন্তু তাকে অন্যায় করার অধিকার দেওয়া হয়নি। অধীনস্থের দায়িত্বশীলকে সম্মান করতে হবে; কিন্তু তার নিজেরও মানবিক মর্যাদা রয়েছে। ইসলাম তাই সম্পর্কগুলোকে ক্ষমতার লড়াই বানায়নি; বরং অধিকার ও দায়িত্বের ভারসাম্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত করেছে।
মতভেদ থাকবে, কিন্তু আদব হারাবে না
আমরা সবাই একভাবে চিন্তা করব না। মতভেদ থাকবে, ভুল থাকবে, সংশোধন থাকবে। কিন্তু মতভেদের কারণে যদি মানুষের সম্মান নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে আমরা ইসলামী আদবের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হারিয়ে ফেলি। সত্যের ব্যাপারে দৃঢ় থাকা এবং মানুষের সঙ্গে উত্তম আচরণ করা, দুটো একসঙ্গে সম্ভব। বরং এটাই কাম্য। সত্যের ক্ষেত্রে আপসহীন, আচরণের ক্ষেত্রে বিনয়ী—এটাই একজন মুমিনের সৌন্দর্য।
মানুষকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন
শেষ পর্যন্ত এই পুরো আলোচনার মূল বিষয়টি শুধু কিছু আদব মুখস্থ করা নয়; বরং মানুষকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করা।
আমি যখন একজন বৃদ্ধকে দেখি, তখন যেন মনে হয়—তিনি সম্মানের অধিকারী।
যখন একজন শিশুকে দেখি, তখন যেন মনে হয়—সে স্নেহের অধিকারী।
যখন একজন আলেমকে দেখি, তখন যেন মনে হয়—ইলমের কারণে তাঁর বিশেষ হক রয়েছে।
যখন একজন অসহায় মানুষকে দেখি, তখন যেন মনে হয়—তার পাশে দাঁড়ানো আমার দায়িত্ব।
যখন কোনো ভুলকারীকে দেখি, তখন যেন মনে হয়—সংশোধন প্রয়োজন, কিন্তু অপমান নয়।
আর যখন এমন কাউকে দেখি, যার সঙ্গে আমার মতভেদ রয়েছে, তখনও যেন মনে থাকে—
সে-ও আল্লাহর একজন বান্দা; তারও কিছু হক রয়েছে।
এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনই মানুষের মর্যাদা রক্ষার প্রকৃত শিক্ষা।
আত্মজিজ্ঞাসা : আমি কি সত্যিই মানুষকে তার প্রাপ্য মর্যাদা দিই?
এবার কিছুক্ষণ নিজের দিকে তাকানো যাক।
আমি কি বয়স ও অবস্থান অনুযায়ী মানুষকে যথাযথ সম্মান করি?
আমি কি ছোটদের প্রতি কোমল ও স্নেহশীল?
মা-বাবার সঙ্গে আমার আচরণ কেমন?
আলেম ও জ্ঞানীদের প্রতি আমার অন্তরে কি সম্মান রয়েছে?
দায়িত্বশীলদের বৈধ নির্দেশ মানার ক্ষেত্রে কি আমি অহংকার করি?
অধীনস্থ বা অপেক্ষাকৃত দুর্বল মানুষদের সঙ্গে আমার আচরণ কেমন?
আমি কি সম্পদ, পদ ও সামাজিক অবস্থানের ভিত্তিতে মানুষের মূল্যায়ন করি?
কারও ভুল দেখলে কি তাকে অপমান করি?
আমার প্রিয় মানুষ অন্যায় করলে আমি কি সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে পারি?
আমার অপছন্দের মানুষ সঠিক কিছু করলে আমি কি তা স্বীকার করতে পারি?
রাগের সময় আমার জিহ্বা ও আচরণ কি নিয়ন্ত্রণে থাকে?
আমি কি কাউকে ক্ষমা করতে পেরেছি?
আমার কথায়, আচরণে কিংবা সামাজিক যোগাযোগে কারও সম্মান নষ্ট হচ্ছে কি?
মানুষ আমার সঙ্গে কথা বললে কি নিজেকে নিরাপদ ও সম্মানিত মনে করে?
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন- আমি কি মানুষের মর্যাদা রক্ষা করি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, নাকি মানুষের কাছ থেকে নিজের মর্যাদা পাওয়ার আশায়?
সুন্দর মানুষ হওয়ার পথে
মানুষের মর্যাদা রক্ষা করা মূলত নিজের অন্তরকে সুন্দর করারই একটি অংশ। যে অন্তরে তাকওয়া থাকে, সেখানে অহংকার কমে। অহংকার কমলে মানুষকে তুচ্ছ করার প্রবণতা কমে। মানুষকে তুচ্ছ না করলে তার মর্যাদা রক্ষা করা সহজ হয়। মর্যাদা রক্ষা করলে সম্পর্কগুলোতে ভালোবাসা ও আস্থা জন্ম নেয়। আর ভালোবাসা ও আস্থার ওপর গড়ে ওঠে একটি সুন্দর পরিবার, সুন্দর সমাজ এবং সুন্দর উম্মাহ।
তাই আমাদের লক্ষ্য শুধু এমন মানুষ হওয়া নয়, যাকে সবাই সম্মান করে; বরং এমন মানুষ হওয়া, যে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য অন্যের সম্মান রক্ষা করে। হয়তো আমাদের হাতে অনেক সম্পদ থাকবে না। হয়তো বড় কোনো পদও থাকবে না। হয়তো মানুষের কাছে আমাদের নামও খুব পরিচিত হবে না। কিন্তু আমাদের কথায় যদি মানুষ শান্তি পায়, আমাদের আচরণে যদি মানুষ সম্মানিত বোধ করে, আমাদের উপস্থিতিতে যদি দুর্বল মানুষ নিরাপদ বোধ করে, আর আমাদের অনুপস্থিতিতেও যদি আমরা মানুষের সম্মান রক্ষা করি, তাহলে ইনশাআল্লাহ, আমাদের চরিত্রে ইসলামের সৌন্দর্যের একটি অংশ ফুটে উঠবে।
শেষ পর্যন্ত একজন মুমিনের সৌন্দর্য শুধু তার পোশাকে নয়, তার কথায় নয়, এমনকি শুধু তার ইবাদতের প্রকাশেও নয়; বরং সে মানুষের সঙ্গে কেমন আচরণ করে, তার মধ্যেও তার ঈমানের সৌন্দর্য প্রকাশ পায়।
আল্লাহ আমাদের এমন অন্তর দান করুন, যে অন্তর অহংকারমুক্ত; এমন জিহ্বা দান করুন, যা মানুষের সম্মান রক্ষা করে; এমন চরিত্র দান করুন, যা মানুষের জন্য রহমতের কারণ হয়।
হে আল্লাহ! আমাদেরকে মানুষের প্রাপ্য মর্যাদা বুঝার এবং যথাযথভাবে তা প্রদান করার তাওফিক দান করুন।
হে আল্লাহ! আমাদের অন্তরকে অহংকার, হিংসা, বিদ্বেষ ও আত্মগর্ব থেকে পবিত্র করুন। আমাদেরকে বড়দের সম্মান করতে, ছোটদের স্নেহ করতে, আলেমদের হক আদায় করতে, দায়িত্বশীলদের বৈধ আদেশ মানতে এবং অধীনস্থদের প্রতি ইনসাফ করতে তাওফিক দিন।
হে আল্লাহ! আমাদেরকে এমন উত্তম আখলাক দান করুন, যার মাধ্যমে মানুষ আমাদের কাছ থেকে নিরাপদ থাকে এবং আমাদের আচরণে আপনার দ্বীনের সৌন্দর্য প্রকাশ পায়।
হে আল্লাহ! আমরা যাদের কষ্ট দিয়েছি, তাদের হক আদায় করার এবং তাদের কাছে ক্ষমা চাওয়ার তাওফিক দিন। আর যারা আমাদের কষ্ট দিয়েছে, তাদের ক্ষমা করার মতো প্রশস্ত অন্তর দান করুন।
হে আল্লাহ! আমাদের ভালোবাসা ও বিদ্বেষ—উভয়কেই আপনার বিধানের অধীন করে দিন। সত্যের ক্ষেত্রে দৃঢ়তা এবং মানুষের সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রে বিনয় ও কোমলতা দান করুন।

হে আল্লাহ! আমাদের এমন বান্দা বানান, যারা মানুষের সম্মান রক্ষা করে এবং নিজের আমল ও চরিত্রের মাধ্যমে আপনার সন্তুষ্টি অর্জন করে। আমীন ইয়া রব্বাল আলামীন।

সমাপ্ত ...আলহামদু লিল্লাহ

Top comments (0)