আকারে ছোট কিন্তু তাৎপর্যে গভীর একটি শব্দ “কিয়ামত”। সেদিন পৃথিবী ধ্বংস হবে। শুধু পৃথিবী না; ধ্বংস হবে সমগ্র বিশ্বজগৎও। চন্দ্র-সূর্য, গ্রহ-নক্ষত্র, কোনো কিছুই সেদিন অবশিষ্ট থাকবে না। একমাত্র মহান রবের গৌরবময়, মহানুভব সত্তাই সেদিন বাকি থাকবে। কুরআনের ভাষা কত সুন্দর:
كُلُّ مَنۡ عَلَیۡهَا فَانࣲ . وَیَبۡقَىٰ وَجۡهُ رَبِّكَ ذُو ٱلۡجَلَـٰلِ وَٱلۡإِكۡرَامِ
অর্থ: ভূ-পৃষ্টে যা কিছু আছে, সবই ধ্বংস হবে। বাকি থাকবে কেবল আপনার প্রতিপালকের গৌরবময়, মহানুভব সত্তা।
إِذَا وَقَعَتِ ٱلۡوَاقِعَةُ . لَیۡسَ لِوَقۡعَتِهَا كَاذِبَةٌ . خَافِضَةࣱ رَّافِعَةٌ . إِذَا رُجَّتِ ٱلۡأَرۡضُ رَجࣰّا . وَبُسَّتِ ٱلۡجِبَالُ بَسࣰّا . فَكَانَتۡ هَبَاۤءࣰ مُّنۢبَثࣰّا .
অর্থ: যখন কিয়ামত ঘটবে, এটার সংঘটন অস্বীকার করার কেউ থাকবে না। এটা কাউকে করবে নীচ, কাউকে করবে সমুন্নত। যখন প্রবল কম্পনে প্রকম্পিত হবে পৃথিবী এবং পর্বতমালা ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে, অতঃপর তা হয়ে যাবে উৎক্ষিপ্ত ধূলিকণা।
বিশাল বিশাল পাহাড়, সেদিন ধূলিকণার মতো উড়তে থাকবে। বাতাসে ভেসে বেড়াবে। সেদিন আরো কতকিছু ঘটবে! আকাশ বিদীর্ণ হবে, নক্ষত্ররাজি খসে খসে পড়বে, পাহাড়সমূহ অপসারিত হবে, ধূলিকণায় পরিণত হবে, সমুদ্র উত্তাল হবে, এই জগতের কোনো কিছুই ঠিক থাকবে না। নতুন করে মানুষকে বের করা হবে কবর থেকে। শুরু হবে হিসেব-নিকেশ। যারা আমরণ কিয়ামত আর পুনরুত্থান দিবসকে অস্বীকার করেছে, তারাও সেদিন উপস্থিত হবে। এটা হলো কী? এই ভাবনায় তাদের কেটে যাবে দীর্ঘ সময়।
কুরআনকে যদি জিজ্ঞেস করি: কিয়ামত কবে সংঘটিত হবে? কুরআন বলবে: এর সঠিক জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ তাআলারই আছে, তবে তা অতি শীঘ্রই সংঘটিত হবে।
يسألك الناس عن الساعة- قل إنما علمها عند الله- وما يدريك لعل الساعة تكون قريبا.
অর্থ: লোকেরা আপনাকে কিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। বলে দিন, এর জ্ঞান কেবল আল্লাহর কাছেই আছে। আপনি এটা কী করে জানবেন সম্ভবত কিয়ামত শীঘ্রই হয়ে যেতে পারে। (সূরাতুল আহযাব ৬৩ নং আয়াত।)
কুরআন আমাদেরকে আরো বলবে: কিয়ামতের ব্যাপারটি তো কেবল চোখের পলকতুল্য, বরং তার চাইতেও নিকটবর্তী।
وَلِلَّهِ غَیۡبُ ٱلسَّمَـٰوَ ٰتِ وَٱلۡأَرۡضِۚ وَمَاۤ أَمۡرُ ٱلسَّاعَةِ إِلَّا كَلَمۡحِ ٱلۡبَصَرِ أَوۡ هُوَ أَقۡرَبُۚ إِنَّ ٱللَّهَ عَلَىٰ كُلِّ شَیۡءࣲ قَدِیرࣱ
অর্থ: আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সকল রহস্য আল্লাহর কতৃত্বে। কিয়ামতের বিষয়টি কেবল চোখের পলকতুল্য, বরং তার চাইতেও নিকটবর্তী। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্ববিষয়ে শক্তিমান। (সূরা আন-নাহল, ৭৭)
পুনরায় যদি কুরআনকে জিজ্ঞেস করি: আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের সময় গোপন রাখলেন কেন? কুরআন বলবে: “যাতে প্রত্যেকেই তার কৃতকর্মের ফল লাভ করে”।
إِنَّ ٱلسَّاعَةَ آتِیَةٌ أَكَادُ أُخۡفِیهَا لِتُجۡزَىٰ كُلُّ نَفۡسِۭ بِمَا تَسۡعَىٰ
অর্থ: কিয়ামত অবশ্যই আসন্ন। আমি তা (অর্থাৎ, তার সময়) গোপন রাখি; যাতে প্রত্যেকেই তার কৃতকর্মের ফল লাভ করে। (সূরা ত্বহা, ১৫)
কিয়ামতের জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ তাআলার কাছেই আছে—এটা বাস্তব। তবে কিয়ামতের অনেক আলামত, যেগুলো একজন মুমিনের জানা থাকা আবশ্যক, কুরআন ও হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, কিয়ামত যত ঘনিয়ে আসছে আমরা কিয়ামত সম্পর্কে ততই গাফেল হচ্ছি। উদাসীন হচ্ছি। যেন কিয়ামত আমাদের থেকে কত যোজন যোজন দূরে! অথচ আমাদের থেকেও দেড় হাজার বছর পূর্বে সাহাবায়ে কেরাম কিয়ামত নিয়ে আমাদের চেয়েও বেশি উদ্বিগ্ন ছিলেন। ভয়ে প্রকম্পিত ছিলেন। দাজ্জালের ফেতনাকে তারা সেসময়ই ভয় করতেন। আর আমরা কিনা দাজ্জালের ফেতনার মধ্যে থেকেও ভীত নই। উদাসীন। বেখবর। পৃথিবীর সবকিছু একটা চূড়ান্ত পরিণতির দিকে কত দ্রুত ধাবিত হচ্ছে। ব্যতীক্রম শুধু বনী আদম। মানুষ। আমরা।
আচ্ছা, আপনার মনে কি কখনো প্রশ্ন জেগেছে— পৃথিবীর ঘটনাপ্রবাহ এত দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে কেন? কোন সে অদৃশ্য শক্তির প্রভাবে পৃথিবী এত দ্রুত মোড় ঘুরছে? কেমন যেন চোখের পলকেই সব উলট-পালট হয়ে যাচ্ছে না? বাঁধভাঙা জলের মতো ফেতনাগুলো এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে কেন বিশ্বব্যাপী। অশ্লীলতা, বেহায়াপনা আর বেলাল্লাপনার নগ্ন থাবা কি সমাজের সবচেয়ে নিরাপদ ঘরটিকেও রেহাই দিয়েছে? অজ পাড়াগাঁয়ের কুঁড়েঘরটিও কি আজ ফিতনামুক্ত? ফিতনার সয়লাব কি সমাজের সর্বত্র বিরাজমান নয়? তবে কি সত্যিই পৃথিবী এক চূড়ান্ত পরিণতির দিকে এগোচ্ছে?
আপনি কখনো ভেবেছেন, শেষ যামানা সংক্রান্ত রাসূলের ভবিষ্যৎবাণীগুলো এত সুন্দর করে খাপে খাপে মিলে যাচ্ছে কেন? খলিফাতুল্লাহ আল-মাহদি যখন আভির্ভূত হবেন তখন মুসলমান একজন ত্রাণকর্তার জন্য অস্থির হয়ে উঠবে, তবে কি সে অবস্থাই তৈরি হচ্ছে আরব বিশ্বে! আমাদের অনেকেরই এগুলো নিয়ে ভাববার ফুরসত হয়ে ওঠে না। আমরা অনেকেই কেবল দুনিয়া গোছাতে ব্যস্ত। অথচ কিয়ামতের আলামতগুলো জানা সময়ের অপরিহার্য দাবি। বিদ্যমান দাজ্জালী ফেতনা সম্পর্কে জানাও সময়ের দাবি। তাই যদি না হবে তাহলে চলমান ফেতনার সয়লাব থেকে নিজেকে রক্ষা করবেন কীভাবে?
সময়ের এই দাবিকে সামনে রেখেই আমরা ভেবেছি, ধারাবাহিকভাবে কিয়ামতের আলামতগুলো নিয়ে আলোচনা করব। তাতে আমাদের একটুও যদি ভাবাবেগ হয়! বিদ্যমান ফেতনাগুলো সম্পর্কে আমরা একটুও যদি সচেতন হই! আমাদের উদাসীনতা, গাফলতির জগদ্দল পাথর একটু হলেও যদি সরে যায়! আল্লাহ যেন আমাদের এই উদ্যোগকে কবুল করেন এবং সহজ করেন। আমীন।
For further actions, you may consider blocking this person and/or reporting abuse

Top comments (0)