বাংলাদেশে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবার পর ছয়মাসেরও অধিক সময় পার হয়ে গেছে। নির্বাচনের আগে, নির্বাচন চলাকালীন সময়ে এব ভোটের ফলাফল প্রকাশের মুহূর্তে ইসলামপন্থীদের মাঝে এক অদ্ভুত উচ্ছাস ও সক্রিয়তা বিরাজ করছিল। যদিও গ'ণ'ত|ন্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ নিয়ে এ ধরনের উচ্ছাস ও প্রত্যাশা বাস্তবতা বিবর্জিত ছিল, কিন্তু তখনকার উচ্ছসিত পরিস্থিতিতে বাস্তবতা বুঝতে হয়তো অনেকেই প্রস্তুত ছিলনা। তাই এতদিন পর আবার একটু স্মরণ করিয়ে দেয়ার জন্য কিছু কথা বলার জরুরত মনে করছি, আশা করি এতদিনে তখনকার সেই বাস্তবতা বিবর্জিত প্রত্যাশা, উচ্ছাস, উত্তেজনা এবং বিভ্রম কিছুটা হলেও স্তিমিত হয়ে এসেছে। আশা করি, শরীয়াহ এবং বাস্তবতার আলোকে নিজেদের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করা আগের তুলনায় আরো সহজ হবে। আল্লাহ তায়ালাই তাওফিকদাতা।
এবারের নির্বাচনে পূর্বের যেকোনো সময়ের চেয়ে অধিক পরিমাণে আলেম সংসদ সদস্য হয়েছেন। গ'ণ'ত'ন্ত্রের হাকীকত সম্পর্কে বেখবর সহজ-সরল ধর্মপ্রাণ অনেক মুসলিম এতে আনন্দিতও হয়েছেন, এটাকে আলেম-ওলামাদের বিজয় হিসেবে দেখেছেন, কিন্তু বাস্তবে গ'ণ'ত'ন্ত্রের আকীদায় বিশ্বাসী সেক্যুলারদেরই বিজয় হয়েছে। আলেমদের মাধ্যমেও গ'ণ'ত'ন্ত্রের বৈধতা উৎপাদন করতে পারা তাদের জন্য মহা-আনন্দের কারণ হয়েছে। বিশেষ করে যখন আলেম-ওলামা এবং ইসলামপন্থী সংসদ সদস্যরা সেক্যুলার সংবিধান রক্ষা করার শপথ নিয়েছেন, তখন বিজয়মাল্য যে সেক্যুলারদের গলায়ই ওঠেছে সেটা বুঝা কি খুব বেশি কঠিন?
আপনার কোনো কাজে আপনার বন্ধু বান্ধব, আত্মীয় স্বজন আপনাকে সাপোর্ট দেবে, পাশে থাকবে, এটা আশ্চর্যের নয় এবং বড় ধরনের সফলতাও নয়। কিন্তু আপনার কাজে যদি আপনার ঘোরতর শত্রুও আপনাকে সাপোর্ট দিতে শুরু করে, তাহলে এটাই বরং সবচেয়ে বড় সফলতা।
গ'ণ'ত'ন্ত্র একটা মতাদর্শ। একটা মতবাদ। একটা জীবনব্যবস্থার নাম। যার সিংহভাগ সরাসরি শরীয়ত বিরোধী বা শরীয়ত বিরোধিতার দিকে ধাবমানকারী। এর প্রতিষ্ঠাতা কাফের মোড়লরা। এর ঠিকানা যুগের হুবল আমেরিকা। খোলসটা খুব চকচকে। মিষ্টি মিষ্টি শ্লোগান আছে। জনগণ সকল ক্ষমতার উৎস। জনগণ যাকে চায় সে-ই সরকার প্রধান হবে। এগুলো শুনতে অনেকের কাছেই ভালো লাগে! একে তো এর বাহ্যিক চাকচিক্য, দ্বিতীয়ত পশ্চিমাদের প্রভাব-এই দুইয়ে মিলে পৃথিবীর অন্যান্য ধর্মের মানুষগুলো গ'ণ'ত'ন্ত্রকে বরণ করে নিয়েছে। কারণ, তাদের ধর্ম তাদেরকে রাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে কোনো দিকনির্দেশনা দেয়নি। মুসলিম প্রধান দেশগুলোর নামমাত্র মুসলিম শাসকগুলোও গ'ণ'ত'ন্ত্রের একনিষ্ঠ খাদেম। আর সাধারণ মানুষ তো বিজয়ী শক্তির দ্বারাই প্রভাবিত থাকে।
তবে বরাবরই গ'ণ'ত'ন্ত্রের বিরোধিতায় সরব থেকেছেন হক্কানী উলামায়ে কেরাম। এর ইসলামবিরোধী দিকগুলো উম্মাহর সামনে স্পষ্ট করার চেষ্টা করেছেন। এদেশের উলামায়ে কেরামের কাছে গ'ণ'ত'ন্ত্র এতটা সফলতা নিয়ে আগে কখনোই পৌঁছতে পারেনি। কিন্তু এবারের নির্বাচনে আলেম-ওলামাদেরকে দিয়ে জনগণের মনে গ'ণ'ত'ন্ত্রের বৈধতার ধারণা তৈরীতে গ'ণ'তন্ত্রের সাফল্য আরো বিস্তৃত পরিসরে প্রকাশিত হলো।
এদেশের অনুসরণীয় অনেক আলেমকেও আমরা বিভিন্ন দলীয় সুবিধা ভোগের আশায় গ'ণ'ত|ন্ত্রিক নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে দেখেছি, যারা এই কিছুদিন পূর্বেও গ'ণ'ত'ন্ত্রের বিরুদ্ধে মাঠে-ময়দানে সোচ্চার ছিলেন। এটা গ'ণ'ত'ন্ত্রের আরো এক ধাপ সফলতা যে, গ'ণ'তন্ত্রের শত্রুরাও এখন গণতান্ত্রিক সিস্টেমে অংশ নিচ্ছে। পার্লামেন্টে কয়েকজন আলেম পাঠিয়ে গ'ণ'ত'ন্ত্র নিজেকে সার্বজনীন মতাদর্শ হিসেবে প্রমাণ করছে। এবারের নির্বাচনে কয়েকজন আলেমের সংসদ সদস্য হওয়া এই প্রমাণকেই শক্তিশালী করে।
আপনি যদি মনে করেন, সংসদ সদস্য আলেমরা সংসদে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রীয় শিরকের বিরুদ্ধে আইন পাশ করতে পারবেন, সুদভিত্তিক অর্থনীতির বিরুদ্ধে কথা বলতে পারবেন, কিংবা মদের লাইসেন্স আর পতিতালয়ের লাইসেন্স বাতিল করতে পারবেন তাহলে আপনি ভুলের উপর আছেন। ইসলামের হুদুদ কিসাসের কথা না হয় না-ই বললাম। শুধু ইনসাফ কায়েম করার নাম যদি দীন কায়েম করা হতো তাহলে ইউরোপ আমেরিকা আর জাপান সবচেয়ে বড় দীনী রাষ্ট্র হয়ে উঠতো। যদি মনে করেন, এই তো মাত্র আলেমদের সংসদে যাওয়া শুরু, আগামীতে আলেমরা সরকার গঠন করবে, তাহলে তো এটাকে দিবাস্বপ্নই বলতে হবে।
গ'ণ'ত|ন্ত্রিক সিস্টেমে আলেমরা কোনো দেশের সরকার গঠন করতে পারবে না। যেকোনো উপায়ে সেটাকে রুখে দেওয়া হবে। আর যদি কোনো আমলে সেটা হয়েও যায়, তাহলে মিশরের পরিণতি ঘটবে। মিশরে ইখওয়ানুল মুসলিমীনের ক্ষমতা মাত্র এক বছর স্থায়ী হয়েছিল। প্রায় একশ বছর মেহনত করে যে ক্ষমতা তাঁরা লাভ করেছিলেন সেটা এক বছরেই শেষ। এবং ওই এক বছরও রাষ্ট্র ও সংবিধানকে পরিপূর্ণভাবে ইসলামীকরণ করে পরিচালনা করা যায়নি। তবুও আমাদের অনেকে গ'ণ'তন্ত্র ছাড়া ভাবতেই পারেননা। তারা মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে গ'ণ'তন্ত্র আমাদের লাগবেই। এটাও আসলে মুসলিমদের মানসিক পরাজয় এবং গ'ণ'তন্ত্রের একটা উল্লেখযোগ্য বিজয়।
অনেক আসনের ক্ষেত্রেই অনিয়ম আর ভোট কারচুপির অভিযোগ রয়েছে। আপনার কাছে যেটা অনিয়ম মনে হচ্ছে, গ'ণ'ত'ন্ত্রের দৃষ্টিতে সেটা অনিয়ম না। দাড়ি টুপিঅলা ভালো মানুষগুলো পরিপূর্ণ নিয়ন্ত্রণসহ ক্ষমতায় যেতে পারবে না এটাই গ'ণ'ত'ন্ত্রের নিয়ম। এই নিয়ম রক্ষার্থে আপনার দৃষ্টিতে অন্যায়, এরকম হাজারটা অন্যায় ন্যায় হয়ে যাবে।
অনেক ইসলামপন্থী প্রার্থী অভিযোগ তুলেছেন নির্বাচনে অনিয়ম এবং কারচুপি হয়েছে। কিন্তু এই অনিয়মের সমাধান আর কার কাছে হবে? ইসির কাছে? সেক্যুলার রাষ্ট্রযন্ত্রের কাছে? সেক্যুলার রাষ্ট্র তো চায়না ইসলামপন্থীরা ক্ষমতায় চলে আসুক। তাহলে এই অবিচারের বিরুদ্ধে বিচার কার কাছে দেওয়া হবে? আল্লাহ তাআলার কাছে? তিনিও তো চান না মানবরচিত এই গ'ণ'ত'ন্ত্রের কাছে ধর্ণনা দিয়ে কেউ ক্ষমতায় এসে তাঁর দীন কায়েম করুক। তিনি তো এই দীনকে পূর্ণ করে দিয়েছেন। কাফেরদের ধার করা কুফুরীতন্ত্র মেনে ক্ষমতায় আসতে হবে অতঃপর তাঁর দীন কায়েম করতে হবে, তিনি তো দীনকে এতটা অসম্পূর্ণ রাখেননি। সুতরাং অভিযোগ এই দরবারেও তো কবুল হবে না।
আমরা মুসলিমরা কতই না অবুঝ এবং আত্মপ্রতারিত! নতুবা গ'ণ'তন্ত্রের মতো একটা স্পষ্ট কুফুরি তন্ত্রকে আজও আমরা খেলাফত প্রতিষ্ঠার পথ হিসেবে গণ্য করতাম না। যুগে যুগে দেশে দেশে গ'ণ'তন্ত্রের কুৎসিত চেহারাটা কি আমরা কম দেখেছি? বিপরীতে যারা গনতন্ত্রকে বর্জন করে দাওয়াহ ও জিহাদের পথ ধরে খেলাফতের পথে এগিয়ে যাচ্ছে, আফগানিস্তান, মালি ও অন্যান্য জায়গায় তাদের সফলতাও কি আমাদের অদেখা আছে? সফলতা আর ব্যর্থতার এত স্পষ্ট পার্থক্যটা বুঝতে আমাদের আর কতকাল সময় লাগবে?
For further actions, you may consider blocking this person and/or reporting abuse
Top comments (0)